এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতার হিসাব
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য চাকরি জীবন শেষে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো তাদের আর্থিক পাওনা। জীবনের দীর্ঘ সময় মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করার পর, বার্ধক্যে এসে প্রাপ্ত এই অর্থই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র সম্বল। তবে এই পাওনা বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতার হিসাব নিয়ে অনেকের মধ্যেই অস্পষ্টতা কাজ করে। কত বছর চাকরি করলে কত মাসের মূল বেতন পাওয়া যায় কিংবা কল্যাণ ভাতার পরিমাণ কেমন হয়, তা সঠিকভাবে জানা থাকলে অবসর পরবর্তী পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য দুটি আলাদা সংস্থা থেকে আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। একটি হলো ‘বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং অন্যটি হলো ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’। এই নিবন্ধে আমরা উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে আপনি নিজেই নিজের অবসর ও কল্যাণ ভাতার টাকা নিখুঁতভাবে হিসাব করতে পারবেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধার মূল ভিত্তি
এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে অবসরের সুবিধা পেতে হলে প্রধান শর্ত হলো আপনাকে ন্যূনতম ১০ বছর এমপিওভুক্ত পদে নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকরি করতে হবে। এই সুবিধা দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
১. কল্যাণ ভাতা (Welfare Benefit): এটি মূলত কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রদান করা হয়।
২. অবসর ভাতা (Retirement Benefit): এটি অবসর সুবিধা বোর্ড থেকে নির্দিষ্ট তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয়।
এই দুটি ভাতার হিসাব মূলত নির্ভর করে আপনার সর্বশেষ আহরিত ‘মূল বেতন’ (Basic Pay) এবং এমপিওভুক্ত হিসেবে ‘মোট চাকরির বছর’-এর ওপর।
১. কল্যাণ ভাতা (Welfare Benefit) বের করার সহজ নিয়ম
কল্যাণ ভাতার হিসাবটি অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বচ্ছ। আপনি যত বছর এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, সেই বছরের সংখ্যাকে আপনার সর্বশেষ মূল বেতন দিয়ে গুণ করলেই কল্যাণ ভাতার পরিমাণ বেরিয়ে আসবে।
হিসাবের সূত্র:
$$\text{কল্যাণ ভাতা} = \text{সর্বশেষ মূল বেতন} \times \text{মোট চাকরির বছর}$$
বাস্তব উদাহরণ ১ (দীর্ঘমেয়াদী চাকরি):
ধরুন, জনাব রফিক ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অবসরে যাচ্ছেন। তার তথ্যাদি নিম্নরূপ:
- সর্বশেষ মূল বেতন: ২৩,৬৪০ টাকা (১০ম গ্রেড)
- মোট চাকরির মেয়াদ: ২৯ বছরহিসাব: ২৩,৬৪০ $\times$ ২৯ = ৬,৮৫,৫৬০ টাকা। অর্থাৎ তিনি কল্যাণ ভাতা হিসেবে পাবেন ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬০ টাকা।
বাস্তব উদাহরণ ২ (মধ্যমেয়াদী চাকরি):
ধরি, জনাবা সুমি ২০ বছর চাকরি পূর্ণ করে অবসরে যাচ্ছেন। তার সর্বশেষ মূল বেতন ২৩,৬৪০ টাকা।
হিসাব: ২৩,৬৪০ $\times$ ২০ = ৪,৭২,৮০০ টাকা।
২. অবসর ভাতা (Retirement Benefit) বের করার নিয়ম ও চার্ট
অবসর ভাতার হিসাবটি কল্যাণ ভাতার মতো সরাসরি বছরের সাথে গুণ হয় না। এক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট গুণক বা মাস (Factor) ব্যবহার করা হয়। আপনার চাকরির মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে সরকার নির্ধারিত একটি ছক রয়েছে, যা অনুযায়ী আপনি কত মাসের মূল বেতন পাবেন তা নিশ্চিত করা হয়।
হিসাবের সূত্র:
$$\text{অবসর ভাতা} = \text{সর্বশেষ মূল বেতন} \times \text{নির্ধারিত মাস (চার্ট অনুযায়ী)}$$
বাস্তব উদাহরণ:
জনাব রফিক ২৯ বছর চাকরি করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরি করলে সর্বোচ্চ ৭৫ মাসের মূল বেতন পাওয়া যায়।
হিসাব: ২৩,৬৪০ $\times$ ৭৫ = ১৭,৭৩,০০০ টাকা।
চাকরির মেয়াদ ও প্রাপ্য মাসের চার্ট (২০২৬ আপডেট)
নিচে আপনার চাকরির মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে কত মাসের বেতন পাবেন তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো। এখান থেকে আপনি সহজেই নিজের প্রাপ্য মাসটি খুঁজে নিতে পারবেন।
| চাকরির মেয়াদ (বছর) | প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধা (মাসের বেতন) |
| ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব ১১ বছরের কম | ১০ মাসের মূল বেতন |
| ১১ বছর বা তদূর্ধ্ব ১২ বছরের কম | ১৩ মাসের মূল বেতন |
| ১২ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৩ বছরের কম | ১৬ মাসের মূল বেতন |
| ১৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৪ বছরের কম | ১৯ মাসের মূল বেতন |
| ১৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৫ বছরের কম | ২২ মাসের মূল বেতন |
| ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৬ বছরের কম | ২৫ মাসের মূল বেতন |
| ১৬ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৭ বছরের কম | ২৯ মাসের মূল বেতন |
| ১৭ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৮ বছরের কম | ৩৩ মাসের মূল বেতন |
| ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৯ বছরের কম | ৩৭ মাসের মূল বেতন |
| ১৯ বছর বা তদূর্ধ্ব ২০ বছরের কম | ৪২ মাসের মূল বেতন |
| ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব ২১ বছরের কম | ৪৭ মাসের মূল বেতন |
| ২১ বছর বা তদূর্ধ্ব ২২ বছরের কম | ৫২ মাসের মূল বেতন |
| ২২ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৩ বছরের কম | ৫৭ মাসের মূল বেতন |
| ২৩ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৪ বছরের কম | ৬৩ মাসের মূল বেতন |
| ২৪ বছর বা তদূর্ধ্ব ২৫ বছরের কম | ৬৯ মাসের মূল বেতন |
| ২৫ বছর বা তার বেশি (সর্বোচ্চ) | ৭৫ মাসের মূল বেতন |
এমপিও শিক্ষকদের বেতন থেকে মাসিক কর্তন
এই সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার শিক্ষকদের মাসিক বেতন (MPO Sheet) থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা কেটে রাখে। বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য ৬% এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৪%, অর্থাৎ মোট ১০% হারে অর্থ প্রতি মাসে কর্তন করা হয়। এই জমানো অর্থ এবং সরকারের অনুদান মিলিয়েই শিক্ষকদের অবসরের বড় অংকের এই ফান্ডটি গঠিত হয়।ত
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১০ বছরের কম চাকরি করলে কি কোনো ভাতা পাওয়া যাবে?
না। নিয়ম অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসর সুবিধা পাওয়ার জন্য কমপক্ষে ১০ বছর এমপিওভুক্ত পদে নিরবচ্ছিন্ন চাকরি করা বাধ্যতামূলক। তবে চাকরি অবস্থায় মৃত্যু হলে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
আবেদনের কতদিন পর টাকা পাওয়া যায়?
বর্তমানে ফান্ড সংকটের কারণে টাকা পেতে ৩ থেকে ৪ বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। তবে বর্তমানে অনলাইন সিস্টেম চালু হওয়ায় আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Status) ট্র্যাক করা যায়।
অবসরের পর শিক্ষক মারা গেলে টাকা কে পাবেন?
শিক্ষক বা কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে তার মনোনীত নমিনি (Nominee) বা আইনগত উত্তরাধিকারীরা একই নিয়মে এই অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
সার্ভিস বুক বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেন জরুরি?
অনলাইন আবেদনের সময় সার্ভিস বুক, এমপিও শিট, যোগদানের কপি এবং নিয়োগপত্র নিখুঁতভাবে জমা দিতে হয়। যেকোনো একটি তথ্যে ভুল থাকলে পেমেন্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে।
শেষ কথা
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতার হিসাব জানা থাকলে শেষ জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে যায়। যদিও বর্তমানে এই টাকা উত্তোলনে বেশ সময় লাগে, তবুও এটি একজন বেসরকারি শিক্ষকের সারাজীবনের উপার্জিত সম্মানী। তাই চাকরিরত অবস্থাতেই সকল রেকর্ড ফাইলবন্দী করে রাখা এবং অনলাইনের প্রতিটি আপডেট খেয়াল রাখা জরুরি। আমরা আশা করি, উপরে দেওয়া উদাহরণ এবং চার্ট দেখে আপনি নিজেই এখন নিজের সম্ভাব্য ভাতার পরিমাণ হিসাব করে নিতে পারবেন। জীবনের শেষ বেলায় এই অর্থ যেন প্রতিটি শিক্ষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে, এটাই কাম্য।



