এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বড় সুখবর
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য ২০২৬ সালে বড় ধরনের এক ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বড় সুখবর ২০২৬ এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বকেয়া সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের পথ প্রশস্ত হলো। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া এমপিও এবং উৎসব ভাতা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর জন্য নতুন একটি অনলাইন বিল সাবমিট অপশন চালু করা হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন প্রাপ্তিতে এনআইডি (NID) জটিলতা, ব্যাংক হিসাবের অমিল কিংবা তথ্যগত ত্রুটির কারণে অনেকের বেতন আটকে যেত। ২০২৬ সালে এসে সেই ভোগান্তি কমাতে সরকার ডিজিটালাইজেশনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। এর ফলে এখন থেকে শিক্ষক পরিবারগুলোকে আর মাসের পর মাস বকেয়া বেতনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনার প্রেক্ষাপট
এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন ও ভাতা সরকারি কোষাগার থেকে এমপিও (Monthly Pay Order) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রদান করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সময় অনেক শিক্ষকের বেতন নানা যান্ত্রিক কারণে বকেয়া পড়ে ছিল। কারো এনআইডি কার্ডের নামের বানানে ভুল ছিল, আবার কারো ব্যাংক হিসাবটি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) পদ্ধতির উপযোগী ছিল না।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নতুন আপডেট অনুযায়ী, এই বকেয়া বেতনগুলো এখন একযোগে ছাড় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে সারা দেশের হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী যারা দীর্ঘকাল আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাদের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা বকেয়া সংশোধনের আবেদন করেছিলেন, তাদের বকেয়া অর্থ এখন দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইএফটি (EFT) পদ্ধতির মাধ্যমে বেতন প্রদান ও এর সুবিধা
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা EFT এর মাধ্যমে সরাসরি তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হচ্ছে। এই পদ্ধতির ফলে আগের মতো চেক সংগ্রহ বা সরকারি দপ্তরে ধরনা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ২০২৬ সালে এই ইএফটি প্রক্রিয়াটিকে আরও নিখুঁত এবং স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন ইএফটি পদ্ধতি বেশি কার্যকর?
- দ্রুত পেমেন্ট: আইবাস ডাবল প্লাস (iBAS++) সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি টাকা ট্রান্সফার হয়।
- স্বচ্ছতা: মাঝপথে টাকা আটকে যাওয়ার বা হয়রানির সুযোগ নেই।
- সহজ বকেয়া উত্তোলণ: নতুন বিল সাবমিট অপশন ব্যবহারের মাধ্যমে বকেয়া অর্থ সরাসরি মূল বেতনের সাথে যোগ হবে।
বকেয়া বেতনের জন্য নতুন বিল সাবমিট অপশন ব্যবহারের নিয়ম
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এখন এমআইএস (EMIS) সিস্টেমে বিশেষ মডিউল ব্যবহার করে শিক্ষকদের বকেয়া বেতনের তথ্য দাখিল করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নির্ভুল হতে হয়। নিচে এই প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:
১. এমআইএস (EMIS) সিস্টেমে লগইন
প্রতিষ্ঠান প্রধানকে তাদের নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে EMIS পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে ‘MPO-EFT’ নামক একটি নির্দিষ্ট মডিউল খুঁজে পাওয়া যাবে। এই মডিউলের মাধ্যমেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বড় সুখবর ২০২৬ এর নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য ইনপুট করতে হবে।
২. বকেয়া মাস নির্বাচন
যেসব শিক্ষক-কর্মচারীর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই পর্যন্ত বকেয়া আছে, তাদের নাম ও মাসের তালিকা তৈরি করে আলাদা আলাদাভাবে সাবমিট করতে হবে। যদি কোনো নির্দিষ্ট মাসে বেতন এবং উৎসব ভাতা উভয়ই বকেয়া থাকে, তবে তাও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
৩. ভুল তথ্য এড়াতে “পেমেন্ট নেই” অপশন
অনেক সময় দেখা যায় অনলাইন এমপিও আবেদনের মাধ্যমে কেউ হয়তো আগে কিছুটা বকেয়া পেয়ে গেছেন। তারা যদি আবার নতুন করে বিল সাবমিট করেন, তবে দ্বৈত পেমেন্টের ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি এড়াতে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যাদের পেমেন্ট অলরেডি হয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে “পেমেন্ট নেই” অপশনটি সিলেক্ট করতে হবে।
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা
নতুন এই অনলাইন পদ্ধতিতে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ইএফটি-এর মাধ্যমে টাকা প্রেরণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দেওয়া তথ্যই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
ভুল তথ্যের কুফল
যদি কোনো কারণে ভুল তথ্য দেওয়া হয় এবং সরকারের অতিরিক্ত টাকা খরচ হয় কিংবা ভুল ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যায়, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষককে বহন করতে হবে। এছাড়া জালিয়াতি বা অসত্য তথ্য প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
অনুপস্থিতি ও মৃত্যুজনিত কারণে বেতন কর্তন
যদি কোনো শিক্ষক কোনো মাসে অনুমোদনহীনভাবে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন, তবে সেই তথ্যটিও বিল সাবমিট করার সময় উল্লেখ করতে হবে। এতে করে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।
২০২৬ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাড়তি প্রাপ্তি
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বড় সুখবর ২০২৬ শুধু বকেয়া বেতন পরিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বছর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট এবং উৎসব ভাতা প্রাপ্তিও আরও সহজ হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে শতভাগ শিক্ষককে কোনো প্রকার যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াই ইএফটি এর আওতায় নিয়ে আসা। এর ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে এবং তারা তাদের কর্মস্থলে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
২০২৬ সালের এমপিও বেতনের বড় সুখবরটি আসলে কী?
২০২৬ সালের প্রধান সুখবরটি হলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন নতুন অনলাইন বিল সাবমিট অপশনের মাধ্যমে দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা।
বকেয়া বেতন পাওয়ার জন্য শিক্ষকদের ব্যক্তিগতভাবে কী করতে হবে?
শিক্ষকদের ব্যক্তিগতভাবে কিছু করতে হবে না, তবে তাদের ব্যাংক হিসাব এবং এনআইডি সংক্রান্ত সঠিক তথ্য প্রতিষ্ঠান প্রধানকে সরবরাহ করতে হবে যাতে তিনি অনলাইনে বিল সাবমিট করতে পারেন।
বকেয়া বেতন কত দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে?
প্রতিষ্ঠান প্রধান সফলভাবে বিল সাবমিট করার পর বিভাগীয় অনুমোদন সাপেক্ষে খুব দ্রুত ইএফটি-এর মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যাংক হিসাবে টাকা চলে আসবে।
যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভুল থাকে তবে কী হবে?
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভুল থাকলে ইএফটি ট্রানজেকশন ফেইল হবে। সেক্ষেত্রে তথ্য পুনরায় সংশোধন করে আবেদন করতে হবে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বড় সুখবর ২০২৬ শিক্ষক সমাজের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বকেয়া বেতন পরিশোধের এই ডিজিটাল উদ্যোগ কেবল শিক্ষকদের আর্থিক সংকট দূর করবে না, বরং শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান করা গেলে ২০২৬ সাল হবে শিক্ষকদের জন্য একটি সফল ও সমৃদ্ধ বছর। শিক্ষকদের উচিত নিয়মিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করা এবং যেকোনো তথ্যগত ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করে নেওয়া।



